আষাঢ় মাস।বৃষ্টি বাদলের ঠিক ঠিকানা নেই। সেদিন সকালেও আকাশ পরিষ্কার ছিল। বিয়ের আর মাত্র ৭ দিন বাকী।বাড়িতে বেশ আমেজ।ডেকরেশনের কাজও শুরু হয়েছে। মিলি দর্জির দোকানে যাচ্ছে। ব্লাউজ আনতে হবে।বাড়ি থেকে বের হয়ে কিছুদূর আসার পরই হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি। তাড়াহুড়ো করে রাস্তার মোড় পর্যন্ত গিয়েই একটা বাস পেল।শহরের উদ্দেশ্য যাত্রা। কিন্তু বাসে একটা সিটও খালি ছিল না।একজন ভদ্রলোক জায়গা ছেড়ে দিয়ে মিলিকে বসতে দিল।মিলিও হুরমুর করে বসে গেল।ধন্যবাদ দিতে গিয়ে চোখ আটকে যায় মিলির।এ যে আসিফ ভাই। তাদের ক্যাম্পাসের বড়ভাই।
মিলি বসে যাচ্ছে। আসিফ তার পাশে দাঁড়িয়ে। মৌনতা ভেঙে আসিফ জিজ্ঞেস করল, ভালো আছো?
মিলি কেবল মাথা নুড়ে কিছু একটা বোঝাল।
এইত সেদিনের কথা,ক্যাম্পাসে নবীব বরণ ছিল।মিলি নির্মলেন্দু গুনের "তোমার চোখ এত লাল কেন" কবিতাটি আবৃত্তি করেছিল।কিন্তু মিলিদের পরিবার ধর্মতান্ত্রিক পরিবার।এসব কেউ পছন্দ করত না।কিন্তু মিলি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ।
আর দুদিন পরে, মিলি ক্যাম্পাসে বান্ধবীদের সাথে গল্প করছিল৷
আসিফ এসে বলব,"তুমি অনেক ভালো আবৃত্তি করেছ,মন ছুঁয়ে গেছে।আমার পছন্দের কবিতা এটা।"
মিলি তখন,কেবল ছোট্ট করে ধন্যবাদ দিয়ে,সেখান থেকে চলে আসল।
মিলি তখনও জানত না,আসিফ ক্যাম্পাসের কিং।সকল মেয়েদের ক্রাস।সবাই আসিফকেই পেতে চায়।কিন্তু কারো সাথে হাই/হ্যালো বলার সময়ও আসিফের নাই।
যেমনি পড়াশোনায় তুখোড়, তেমনি সৌন্দর্যে, ব্যবহারেও মিষ্টতা।
আসিফের সাথে মিলির প্রায়ই দেখা হত।আসিফ একান্তে মিলিকে চাইত। মিলির সাথে বসে দুদন্ড কথা বলতে চাইত।মিলিও সব বুঝত।আসিফকে তার খুব ভালো লাগত।কেউ কিচ্ছু বলতে পারত না।নেহাত এতটুকু সম্পর্ক নষ্ট হাওয়ার ভয়ে।আসিফ ভাবত,সে যা ভাবে,মিলি হয়ত তা ভাবে না।তেমনি মিলিও ভাবে,আসিফ হয়ত এতকিছু ভাবে না।তার থেকেই বড় সমস্যা মিলির পরিবার। তাই আর সে ভাবতেও পারেনা।আবার অস্বীকারও করতে পারেনা।
একদিন মিলি বাস থেকে নেমেই ক্লাসর দিকে দৌড়াছে।হঠাৎ আসিফ উদয় হয়।হাতে বৃষ্টি ভেজা কদম গুচ্ছ। ইতস্তত করে বলে,একটু কথা বলব।একটু বসবে বকুল তলায়?
আসিফ সুন্দর করে গুছিয়ে সমস্ত না বলা কথা বলে। মিলি সব শুনল,কিন্তু কিছু বলতে পাচ্ছে না।লজ্জায় তার মুখে লাল আভা এসে পড়ছে।এর মধ্যে একটু ঘেমেও গেছে।মিলি কিছু নাহ বলে,অনেকটা পালিয়ে বাঁচার মত পালিয়ে গেল।
কিন্তু তাতেই বা কি হল।ভার্সিটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল মিলির বড় ভাই,মুবিন। কি ভেবে যেন সেদিন ক্যাম্পাসে আসল।বোনের সাথে দেখা করে যাবে।ক্লাস নাহ থাকলে একসাথে ফিরবে হয়ত।কিন্তু মুবিন এসে ঠিকিই দেখল,তার বোন কারো একজনের সঙ্গে বকুল তালায় বসে কথা বলছে।সে পিছন থেকে দেখেই ফিরে গেলে,সামনে এলো না।
ছেলেরা হয়ত অনেক কিছুই সহ্য করতে পারে,কিন্তু নিজের বোনকে অপরিচিত কোন ছেলের সঙ্গে দেখলে সহ্য করতে পারেনা। তবে সেই ভাইটাও অন্য কারো বোনের সঙ্গে প্রেম করাকে পবিত্র বা নিরাপরাধ মনে করে।
আর সেইদিন টাই হল,মিলির ক্যাম্পাসে শেষ দিন।
বাসা ফিরল সেই কদম গুচ্ছ নিয়ে। কিন্তু সে পুরোপুরি গৃহবন্দি হয়। ৫/৬ দিনের মধ্যে বিয়েও পাকা।পরিবারের পছন্দ করা ছেলে।হয়ত ভালোই হবে। অমত করার সাহস মিলির ছিল না।
আজ দেখা,বাস থেকে নেমে দর্জির দোকানে যাচ্ছে মিলি। পিছন পিছন আসিফও যাচ্ছে। তখন বৃষ্টি কেটে গেছিল।কিন্তু আকাশ ঘন কালো।যে কোন মূর্হুতে আবার ঝড়বে।
মিলি ব্লাউজ নিয়ে বাসে উঠল।আসিফও উঠল।দু'জনেই নিশ্চুপ। রাস্তার মোড়ে এসে,বাস থেকে নেমে মিলি বাড়ির উদ্দেশ্য যাচ্ছে। হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়।এবার আসিফ আর চুপ থাকে নাহ।আভিমান আর অভিযোগে একত্রে জানতে চায়,'তার অপরাধ কি?কেন সে ভার্সিটি যায় না?যোগাযোগ রাখেনি?'এরপর অনুরোধে বলে,ক্ষমা করে দিও,তবু আমার জন্যে পড়াশোনা বন্ধ করিও না।নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। তোমাকে আর কখনো ডিস্টার্ব করব না।আর তোমার সামনেও কখনো আসব না।
ঠিক তখুনি বৃষ্টি শুরু হল।অঝোর বৃষ্টি।
মিলি কেবল বলল , আমার দেড়ী হয়ে যাচ্ছে।সাতদিন আর বাকি বিয়ের। বিয়ের কনে এতক্ষণ বাহিরে থাকা ঠিক না।কেউ দেখলে ঝামেলা হবে।
অনেক দুঃখ নিয়ে কথাগুলো বল্লেও সে বুঝতে দিল নাহ,মিলিও তাকে কতটা চাইত।মিলিটা কেবল বোঝাল,সে আসিফের প্রতি বিরক্ত।তখুনি সোজা চলে গেল।একবার পিছনে ফিরে দেখল না।
বাড়ির কাছে এসে, পিছনে তাকালো মিলি।মানুষটা হাঁটু ভেঙে মাঝ রাস্তায় ছেলেটা তখনো।উপরে তাকিয়ে দু'হাত দিয়ে মুখ চেপে অঝোরে কাঁদছে। এটাই ছিল,আসিফের প্রথম প্রেম। আর বৃষ্টির পানি তার দিকে যেন গুলির মত ধেয়ে আসছে।ভারী বর্ষনে তার কান্নার আওয়াজ আর শোনা যাচ্ছে না।
এ এক করুন দৃশ্য, এদিকে,মিলির চোখের পানি, বৃষ্টির পানি ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
-কুড়িগ্রাম
0 মন্তব্যসমূহ
মন্তব্য বিষয়ক দায়ভার মন্তব্যকারীর। সম্পাদক কোন দায় বহন করবে না।